২১ সেপ্টেম্বর : লকডাউনের সময়কালে রাজ্য সরকার অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলি সংকোচিত করেনি । অন্যদিকে রাজ্য সরকার রাজ্যের অর্থনীতির উন্নতিসাধনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে । সোমবার রাজ্য বিধানসভায় কোভিড -১৯ মােকাবিলায় রাজ্য সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব একথা বলেন । তিনি বলেন , এম জি এন রেগার কাজ এখন পর্যন্ত পুরােদমে চলছে এবং আজ পর্যন্ত ১.৯৭ কোটি শ্রমদিবসের সৃষ্টি হয়েছে যাতে ৫২২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং রেগার কার্ডধারী প্রত্যেক শ্রমিকদের গড়ে ৩৬ দিনের কাজ প্রদান করা হয়েছে ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন , মুখ্যমন্ত্রী স্বনির্ভর যােজনা চালু করা হয়েছে যাতে ১ লক্ষ ক্ষুদ্র দোকানীদের ঋণ প্রদান করা যায় । পরিবারগুলিকে আত্মনির্ভর করে গড়ে তােলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী স্বনির্ভর পরিবার যােজনা চালু করা হয়েছে । শ্রীমন্তপুরে অস্থায়ী জেটি নির্মাণ , জলপথে আখাউড়া এবং শ্রীমন্তপুর চেকপােস্টে কার্গোর ট্রায়াল রান , সাবুমে সেজ - র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন , বাঁশের বােতল এবং বশিকড়ােলের বিস্কুট বাজারজাতকরণের মধ্য দিয়ে রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টা এগিয়ে চলছে । মুখ্যমন্ত্রী বলেন , এর ফলে আশা করা হচ্ছে রাজ্যের জিডিপি - র অবস্থা দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতাে কমবে না এবং এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়বে না ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন , সারা বিশ্বে এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন এই মহামারি আঘাত করে তখন এই ত্রিপুরা এই মাত্রায় মােকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলাে না । রাজ্যে এন -৯৫ মাস্ক অনেক কম ছিলাে । জনগণ মাস্ক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না । পিপিই কিট , ভেন্টিলেটর , কোভিড চিকিৎসা সংক্রান্ত ওষুধপত্র এবং অন্যান্য প্রয়ােজনীয় সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ছিলাে । ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে কোভিড -১৯ সংক্রমণ প্রতিরােধে রাজ্য সরকার প্রতিরােধমূলক এবং বেশ কিছু প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে । বিমানবন্দরে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে থার্মাল স্ক্যানিং শুরু হয়েছে । রাজ্যের প্রবেশপথ চুড়াইবাড়ি , রেলওয়ে স্টেশন ও স্থলবন্দরে বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং টেস্ট চালু হয় । রাজ্য সরকারের সক্রিয়ভাবে প্রাক পদক্ষেপের ফলে এপ্রিল ২০২০ - এর প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাজ্যে কোনও পজিটিভ কেইস ছিলাে না । প্রতিরােধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২৪ মার্চ , ২০২০ প্রধানমন্ত্রী দেশজুড়ে ২১ দিনের প্রথম পর্যায়ের লকডাউন ঘােষণা করেন , যাতে ১৩০ কোটি ভারতবাসীর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায় । আন্তঃরাজা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে সমস্ত যাত্রী পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয় । শুধুমাত্র অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা চালু রাখা হয় । এই সংকটকালীন অবস্থায় রাজ্য সরকার অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী ও পেট্রোপণ্যের কৃত্রিম সংকট রােধ ও মূল্যবৃদ্ধি রােধ নিশ্চিত করে । রাজ্য সরকার লকডাউনের সময়কালে রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ত্রাণ কর্মসূচি চালু করে । শুধুমাত্র রাজ্যের বসবাসকারী জনগণই নয় এমনকি রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানকারী ৪০ হাজার নাগরিকদেরকে এই ত্রাণ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে । ১৭ দিনেরও বেশি সময় রাজ্যের চল্লিশ লক্ষেরও বেশি নাগরিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের খাদ্য এবং প্রয়ােজনীয় সামগ্রী তাঁদের কাছে পৌছে দেওয়া হয় । লকডাউন চলাকালীন সময়ে রাজ্য সরকার ত্রাণ সম্বলিত বিষয়গুলি কার্যকর নিশ্চিত করেছে । প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যােজনায় ৮ মাস বিনামূল্যে রেশন , শস্য দানা । চানা ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অ্যাক্টভুক্ত ৫.৭৯ লক্ষ পরিবারকে প্রদান করা হয়েছে । ১২ টি অ্যাসপিরিশন্যাল ব্লকের রেগার শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং ২ মাসের সামাজিক ভাতা একসাথে প্রদান করা হয়েছে । সমাজের বিভিন্ন অংশের জনগণের জন্য ৩০০ কোটি টাকার ত্রান সম্প্রসারিত করা হয়েছে যার মধ্যে বরাদ্দ রয়েছে এডিসি এলাকার জন্যও । অন্যান্য রাজ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কেটে নেওয়া হয়েছে কিন্তু ত্রিপুরায় কর্মচারীদের বেতন কাটা হয়নি । রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই নতুন ৩০ হাজার সামাজিক ভাতা প্রদানের ঘােষণা করেছে এবং ১০ হাজার নতুন সরকারি চাকরিতে নিয়ােগের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন , কেন্দ্রীয় সরকারের সহযােগিতায় রাজ্য সরকার সুনিশ্চিত করেছে যে রাজ্যের সমস্ত নাগরিক যারা বহিরাজো অবস্থান করছে তারা প্রশাসনের তরফ থেকে প্রয়ােজনীয় সহযােগিতা যাতে পায় । বহিরাজ্যে অবস্থানরত ছাত্রছাত্রী , রােগী এবং পরিযায়ী শ্রমিকরা যাতে রাজ্য থেকে প্রয়ােজনীয় সহযােগিতা পেতে পারেন তারজন্য রাজ্যের বাইরে ত্রিপুরা ভবনের সহযােগী কর্মী ও আধিকারিকরা দিনরাত কাজ করছেন । অতিমারির শুরুর পর্যায়ে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রকের গাইডলাইন অনুসারে আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং জিবিপি হাসপাতালে ডেডিকেটেড আইসােলেশন এবং ট্রিটমেন্ট সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে । বর্তমান পরিকাঠামােকে শক্তিশালী করতে রাজ্য সরকার আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজের টিচিং হাসপাতালের ২ নং ব্লককে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ঘােষণা করেছে । রাজ্যের সব জেলাগুলিতে সঠিক সময়ে মাস্ক পি পি ই / স্যানিটাইজার / ওষুধ এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পরিমাণে এইসব সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে । এই সব প্রাক উদ্যোগ এবং অগ্রিম সুবিধা নেওয়ার ফলে এপ্রিল মাসে এবং এমনকি দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনের শেষ অবধিও রাজ্যে পজিটিভ কেইসের সংখ্যা ছিলাে মাত্র ৩ । ১ মে ভারত সরকার দেশব্যাপী লকডাউন ( ফেজ - থ্রি ) আরও দুই সপ্তাহ বাড়িয়ে ১৭ মে পর্যন্ত ঘােষণা করে । সংক্রমণের তীব্রতার নিরিখে সরকার সমস্ত জেলাগুলিকে গ্রিন , রেড ও অরেঞ্জ এই তিনটি জোনে ভাগ করে । সেই অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় কিছু ছাড় দেওয়া হয় ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের কল্যাণে ভারত সরকার বিভিন্ন বড় বড় শহর থেকে আগরতলার সাথে পয়েন্ট - টু - পয়েন্ট রেল পরিষেবা শুরু করে । ভারতের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া ৩৬,০০০ - এর বেশি লােককে ত্রিপুরায় আনা হয় এবং সমপরিমাণে পরিযায়ী শ্রমিকদের তাদের নিজ নিজ রাজো ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় । বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম রাজ্য যেখানে রাজ্যের বাইরে থেকে আসা এবং বাইরে যাওয়া পরিযায়ী লোকদের খরচ বহন করা হয় । এছাড়াও এই করোনা সংকট পরিস্থিতিতে রাজ্যবাসীর স্বার্থে সরকারের বিভিন্ন জনমুখী পদক্ষেপ গুলির কথা, বিস্তারিতভাবে বিধানসভাকে অবগত করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন বিকেলের বিমানে নয়াদিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাননীয় শ্রীঅমিত শাহ এর সঙ্গে দেখা করেন। উত্তর ত্রিপুরা জেলার ব্রু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে বিস্আতৃত লোচনা করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চয়তা দিয়েছেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। একই সঙ্গে সাব্রুমের আইসিপি ফান্ড রিলিজ, পুলিশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য তহবিল সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। গৃহমন্ত্রকের আধিকারিকদের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ত্রিপুরা জনজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করার বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাননীয় শ্রীঅমিত শাহজির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।






0 মন্তব্যসমূহ